আধিপত্যবাদের কাঁটাতার

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। কুড়িগ্রামের অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ভোরের কুয়াশা মাখা কাঁটাতারে ঝুলে ছিলো, ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানী খাতুনের নিথর দেহ। মই দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় কাপড় আটকে যাওয়ায় ভয়ে চিৎকার দিয়েছিলো সে, আর সেই চিৎকারের জবাব দেওয়া হয়েছিলো মরণঘাতী গুলিতে। এরপর টানা পাঁচ ঘণ্টা নিথর ফেলানীর দেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিলো। মাথা এক দিকে, পা অন্য দিকে! এটি ছিলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিতর্কিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ এবং বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্তের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ কাঁটাতারে ঘেরা। একে বিশ্বের অন্যতম ‘রক্তাক্ত সীমান্ত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তে ‘পাখির মতো’ মানুষ মারার যে সংস্কৃতি চালু করেছে, তার প্রতীক ফেলানী। সীমান্তে এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। যখন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিককে অন্য দেশের বাহিনী বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করে এবং তার বিচার হয় না, তখন বুঝতে হবে সেই দেশের স্বাধীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে দুই দফায় বিএসএফ-এর বিশেষ আদালত অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়। ফেলানী হত্যার প্রধান আসামীর দুইবার খালাস পাওয়া, আধিপত্যবাদী দম্ভের বহিঃপ্রকাশ।

এই নিষ্ঠুরতার সিলসিলা কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা ঢুকে পড়েছে আমাদের শিক্ষাঙ্গনে, আমাদের চিন্তায় এবং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে। আধিপত্যবাদ কেবল বুলেটে নয়, বরং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার মাধ্যমেও নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল কেনো? কারণ, তিনি ভারতের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়াজ তুলেছিলেন। সীমান্তের কাঁটাতারে ফেলানী যেমন বাহ্যিক আধিপত্যের শিকার, শহীদ আবরার ফাহাদও তেমনি অভ্যন্তরীণ ‘দাদাগিরি’ ও নতজানু রাজনীতির শিকার।

একইভাবে ওসমান হাদী এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শুরু করেছিলেন। তিনি যুক্তি এবং মেধা দিয়ে এই অসম রাজনৈতিক সমীকরণের অসারতা তুলে ধরছিলেন। কিন্তু এই লড়াইও সহ্য করেনি আধিপত্যবাদের দোসররা, ওসমান হাদীকেও নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবরার ও হাদীদের মতো মেধাবীদের রক্তভেজা মাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধিপত্যবাদ কেবল সীমান্ত এলাকা দখল করে না, সে আমাদের বিচারবুদ্ধি এবং প্রতিবাদের ভাষাকেও হত্যা করতে চায়। এই দুই হত্যাকাণ্ড একই সূত্রের গাঁথা। যেই সূত্রটি আমাদের শেখায়, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা এই জনপদে সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ।

বাংলাদেশ-ভারতের বহু বছরের এই সংকটের পেছনে একটি সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করে। ফেলানী, আবরার বা হাদীদের জীবনের মূল্য কেনো এতো কম? কেনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ‘রক্তাক্ত সীমান্ত’ নিয়ে চুপ থাকে? এর অন্যতম কারণ এই অঞ্চলের মানুষের মুসলিম পরিচয়।

ভারতের ‘বিজেপি-আরএসএস’ নিয়ন্ত্রিত রাজনীতিতে যখন ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে ঘৃণা ছড়ানো হয়, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বিএসএফ-এর বন্দুকে। ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির একটি বড় অস্ত্র হলো ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা। এনআরসি (NRC) এবং সিএএ (CAA)-এর মতো আইনগুলোর মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়, তার সরাসরি বলি হতে হয় ফেলানীর মতো সাধারণ মুসলমানদের। বিএসএফ-এর জওয়ানদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, সীমান্ত পার হওয়া প্রতিটি মানুষই ‘শত্রু’। ফেলানীর লাশ যখন কাঁটাতারে ঝুলে থাকে, তখন সেটি আসলে এই অঞ্চলের মুসলিম অস্তিত্বের ওপর এক চরম অবমাননা।

সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সীমান্তে লাশের মিছিল থামে না। ফেলানীরা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা না। তারা আমাদের এই জনপদের মজলুম অস্তিত্বের একেকটি জীবন্ত সাক্ষী। ফেলানীর ঝুলে থাকা লাশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জালিমের দম্ভ আর মজলুমের রক্ত আজ এক অসম লড়াইয়ে লিপ্ত। এই শৃঙ্খল ভাঙার জন্য আমাদের আজ এক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রয়োজন। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসবে যখন আমরা কেবল এক রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে, আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হবো এবং প্রতিটি নাগরিকের রক্তের হিসাব বুঝে নিতে শিখবো। ফেলানী থেকে আবরার, প্রতিটি শাহাদাত যেন আমাদের চেতনায় এক পরাধীনতা বিরোধী ইনকিলাবের ডাক দেয়। জালিমের আধিপত্য ভেঙে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর ইনসাফ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলুক। ইনশাআল্লাহ, মজলুমের এই আর্তনাদ একদিন জালিমের সিংহাসন কাঁপিয়ে দেবেই।

আরো পড়ুন