
কুরআন কি আমাদের জীবনের বসন্ত?
এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার কাছে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ তার আয়াতসমূহ গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বুদ্ধিমানেরা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা ছদ- ২৯)
তাফসির: (তাফসির ইবনে কাসির)
হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনের শব্দগুলো মুখস্থ করেছে, কিন্তু কুরআনের উপর আমল করেনি এবং কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণাও করেনি, তার কুরআনের শব্দগুলো মুখস্থ করাতে কোনই লাভ নেই।
লোকেরা বলেঃ “আমরা কুর’আন সম্পূর্ণরূপে পড়েছি।” কিন্তু কুরআনের একটি উপদেশ এবং কুরআনের একটি হুকুমের নমুনা তাদের মধ্যে দেখা যায় না। এরূপ হওয়া মোটেই উচিত নয়। আসল জিনিস হলো চিন্তা-গবেষণা করা, শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা এবং আমল করা।
উপরে সূরা ছদ-২৯ নম্বর আয়াতটি পড়ার পর আমরা নিজেদেরকে নিয়ে একটু ভাবতে পারি। কুরআনের সকল নির্দেশ কি পালন করতে পারছি? পুরোপুরিভাবে পালন করতে না পারলেও নিজেদের সর্বোচ্চ ইফোর্ট কি দিচ্ছি?
একাডেমিক পড়াশুনায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হবার জন্য তো কত চিন্তাভাবনা করি, নোট লিখি, কুরআনের আয়াত নিয়ে কি চিন্তাভাবনা করছি?
অনেকে মাশা আল্লাহ জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীসহ অন্যান্য অনেক বিজাতীয় দিবস পালন করেন না৷ কিন্তু বড় অনেক ফরজ ইবাদাত যেমন: পর্দা করা, ৫ ওয়াক্ত সালাত নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা, যাকাত দেওয়া ইত্যাদি কে গুরুত্ব দিচ্ছেন না না৷ আসুন দেখি কুরআনে কি বলা হয়েছে:
“তবে কি তোমরা কুরআনের কিছু অংশ মানবে, আর কিছু অংশ মানবে না? যদি এমনটি করো, তাহলে দুনিয়াতেই তোমাদের উপর নেমে আসবে লাঞ্চনা ও আখিরাতে রয়েছে কঠোর আযাব।”
(সুরা বাকারা, আয়াত :৮৫)
আমরা যদি কুরআনের বিধি-নিষেধ পালন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তাহলে এটার জন্য কত বড় পুরষ্কার আছে জানেন? চলুন কুরআনের নিচের আয়াতটা দেখি:
সুরা বাকারা: ২১২
হ্যাঁ, বরং যে নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিবে এবং সৎকর্মশীল হবে তার পুরস্কার তার প্রভুর কাছে থাকবেই। এধরনের লোকদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
তাফসির:
আল্লাহ্র কাছে কোনো বান্দার আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে দু’টি বিষয়:
এক. ইখলাস তথা বান্দা মনে-প্রাণে নিজেকে আল্লাহ্র কাছে সমৰ্পন করবে।
দুই. রাসূলের পরিপূর্ণ অনুসরণ। অর্থাৎ যদি কেউ মনে-প্রাণে আল্লাহ্ তা’আলার আনুগত্যের সংকল্প গ্রহণ করে কিন্তু আনুগত্য ও ইবাদাত নিজের খেয়াল-খুশীমত মনগড়া পন্থায় সম্পাদন করে, তবে তাও জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, বরং এ ক্ষেত্রেও আনুগত্য ও ‘ইবাদাতের সে পন্থাই অবলম্বন করতে হবে, যা আল্লাহ্ তাআলা রাসূলের মাধ্যমে বর্ণনা ও নির্ধারণ করেছেন।
আখেরাতের মুক্তি ও জান্নাতে প্রবেশের জন্য শুধু ইখলাসই যথেষ্ট নয়, বরং সৎকর্মও প্রয়োজন।
বস্তুতঃ কুরআন ও রাসূল (সা:) এর সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যশীল শিক্ষা ও পন্থাই সৎকর্ম। আল্লাহ্র ইখলাস ও রাসূলের আনুগত্যের ব্যাপারে মানুষের অবস্থান চার পর্যায়ে:
ক) কারো কারো ইখলাস নেই, রাসূলের আনুগত্যও নেই, সে ব্যক্তি ‘মুশরিক’, ‘কাফের।’
খ) কারো কারো ইখলাস আছে, কিন্তু রাসূলের আনুগত্য নেই, সে ব্যক্তি ‘বিদ’আতকারী।’
গ) কারো কারো ইখলাস নেই, কিন্তু রাসূলের আনুগত্য আছে (প্রকাশ্যে), সে ব্যক্তি ‘মুনাফেক।’
ঘ) কারো কারো ইখলাসও আছে, রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণও আছে, সে ব্যক্তি হলো প্রকৃত ‘মুমিন।’
[তাজরীদুত তাওহীদিল মুফীদ]
আমরা অনেক সময় কুরআনের নিচের আয়াতের উদাহরণ দিয়ে নিজের হিদায়াতের জন্য দু’য়া করতে অনীহা প্রকাশ করি:
তুমি যাকে পছন্দ করো, তাকে হেদায়াত করতে পারবে না, তবে আল্লাহ্ তা‘আলাই যাকে ইচ্ছা হেদায়াতের পথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই অধিক অবগত আছেন’’। (সূরা কাসাস: ৫৬)
অথচ সূরা বাকারা’তে কত আশার বাণী আছে দেখুন:
১৮৬. যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করে, তখন তুমি বল আমি তো কাছেই আছি। কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। অতএব তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক ও বিশ্বাস রাখুক। তাতে তারা হেদায়েত পাবে।
২০৮. হে ঈমানদার গণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ কর না। নিশ্চিয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
আমরা অনেকেই কুরআন তিলাওয়াত করি, অর্থ পড়ি। কিন্তু সেই অর্থ পড়ে একটু চিন্তাভাবনা করি না। আসুন কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করি৷ এটাই তো মুসলমানদের জীবন বিধান তাই না?
হে আমার রব, কুরআনকে আমাদের জীবনে লালন- পালন করার তৌফিক দিন, কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত বানিয়ে দিন, আমাদের সকলকে কুরআনের আলোকে জীবন গড়ার তৌফিক দিন। আমীন।
আসুন পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব সবার জন্য আমাদের রবের কাছে দু’য়া করে যাই। ইনশা আল্লাহ৷




