
নিকাব কি মুসলিমদের পোষাক?
আমাদের দেশে ‘তথাকথিত এলিট’ হয়ে উঠার খুব সস্তা আর সহজ শর্টকাট মনে হয় ইসলামোফোবিক আচরণ। ইসলাম, নারীর হিজাব কিংবা নিক্বাব নিয়ে দুই-একটা উল্টাপাল্টা নোংরা কথা বললেই এই দেশে একাডেমিক হিসেবে বিশেষ সম্মান পাওয়া যায়। সম্প্রতি জনৈক রাজনৈতিক নেতার নিক্বাবকে কুরুচিকর ইতিহাসের সাথে তুলনা করা এবং ইহুদি নারীদের অশালীন পেশার সাথে গুলিয়ে ফেলা, সেই সস্তা মানসিকতা ও চরম ধৃষ্টতারই বহিঃপ্রকাশ।
ইসলামে ‘জিলবাব’ এবং ‘খিমার’ (ওড়না বা বড় চাদর) এর বিধান সরাসরি ক্বুরআন থেকে এসেছে।[১] জাহেলি যুগে আরব নারীরা ওড়না পরত ঠিকই, কিন্তু তারা তা ঘাড়ের পেছনে ফেলে রাখতো, যার কারনে বুক ও কান অনাবৃত থাকতো।[২] ইসলাম এসে সেই পোশাকের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনে এবং পুরো শরীর আবৃত করার নির্দেশনা দেয়। ‘নিক্বাব মুসলমানদের পোশাক না’, এধরনের ঘৃণ্য বক্তব্য যারা ছড়ায়। তাদের এসব বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে ইসলামের শ্রেষ্ঠযুগের নারী সাহাবিয়াতগনের কয়েকটা ঘটনা মাধ্যমে নিক্বাবের সত্যতা একটু যাচাই করি।
১. হযরত আ’ইশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “আল্লাহ্ তা‘আলা প্রাথমিক যুগের মুহাজির মহিলাদের উপর রহম করুন, যখন আল্লাহ্ তা‘আলা এ আয়াত ‘তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে'[৩] অবতীর্ণ করলেন, তখন তারা নিজ চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমণ্ডল ঢাকল”[৪]। যদি নিক্বাব (মুখমন্ডল ঢাকা) ইসলামের অংশ না হতো, তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী নারীগণ এই কাজ করতেন না।
২. বিখ্যাত ইফকের ঘটনায় আ’ইশা (রা.) যখন মরুভূমিতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর চেহারা অনাবৃত হয়ে পড়েছিলো। সাহাবী হযরত সাফওয়ান (রা.) তাঁকে দূর থেকে দেখে চিনে ফেলেন। আ’ইশা (রা.) বলেন, “তিনি আমাকে দেখে চিনে ফেললেন কারণ পর্দার বিধান আসার আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। তিনি যখন উচ্চস্বরে ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়লেন, আমি জেগে উঠলাম এবং তৎক্ষণাৎ আমার চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম” [৫] এই ঘটনায় এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, পর্দার বিধান নাজিলের পর সাহাবিয়াতগন (রা.) তাঁদের চেহারা পুরুষদের সামনে অনাবৃত রাখতেন না।
৩. হজের ইহরাম অবস্থায় আলাদা সেলাই করা নিক্বাব পরা নিষেধ। কিন্তু এর মানে এই না সাহাবিয়াতগণ পুরুষদের সামনে মুখ খোলা রাখতেন। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) এবং ফাতেমা বিনতে মুনযির (রহ.) বর্ণনা করেন, “আমরা ইহরাম অবস্থায় থাকতাম। যখন পুরুষদের কাফেলা আমাদের পাশ দিয়ে যেতো, তখন আমরা আমাদের মাথার ওপর থেকে চাদর টেনে মুখ ঢেকে নিতাম, তারা চলে গেলে আবার খুলে দিতাম”[৬]। অর্থাৎ, ইবাদতের বিশেষ অবস্থায়ও তাঁরা চেহারা আবৃত রাখতেন।
৪. হযরত কায়েস ইবনে শামমাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন। তাঁকে উম্মে খাল্লাদ বলে ডাকা হতো। তার মুখ ছিল নিক্বাবে ঢাকা। তিনি আল্লাহর পথে তার শহীদ পুত্র সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জানতে এসেছিলেন। তখন তাঁকে এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তোমার পুত্র সম্পর্কে জানতে এসেছ, আর মুখে নিক্বাব। তখন হযরত উম্মে খাল্লাদ (রা.) তাঁকে উত্তরে বললেন, আমি আমার ছেলেকে হারিয়ে এক বিপদে পড়েছি। এখন লজ্জা হারিয়ে তথা মুখমণ্ডলসহ গোটা শরীর পর্দা না করে কি আরেক বিপদে পড়বো?[৭] এই সাহাবিয়াত মুখ অনাবৃত করাকে সন্তান হারানোর মতো বিপদের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের চেয়ে বিশুদ্ধ আর নির্মল ইসলাম আর কারোর কাছে নেই। সেই সময় সাহাবীরা সরাসরি ওয়াহীর নিখুঁত জ্ঞানের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত করতেন। তাদের প্রত্যেকটি কর্মকান্ডের মানদণ্ড ছিলো, ওয়াহী ও রিসালাত। সেই সময়কার নারীরা ইবাদাতের বিশেষ মুহুর্তে, সফর কিংবা সন্তান শহীদ হওয়ার মতো কঠিন মুহুর্তেও তাঁদের চেহারা আবৃত রাখতেন। কিন্তু দেড় হাজার বছর পর এসে, ইসলামের মিনিমাম জ্ঞান রাখে না এমন পলিটিক্যাল এলিটরা মুসলিমদের পোশাকের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেয়!
কোনো তথাকথিত বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি নারীর হিজাব নিক্বাব নিয়ে নোংরা কটাক্ষ করেন, তখন তথাকথিত এলিট নারী অধিকারবাদীদের মুখে কুলুপ পড়ে থাকে। তারা নারীর পোশাকের স্বাধীনতার বুলি আওড়ায় ঠিকই, কিন্তু কেউ যদি একজন মুসলিম নারীর হিজাব কিংবা নিক্বাবের স্বাধীনতা নিয়ে ট্রল করে, তখন তাদের কাছে এটাকে ‘নিপীড়ন’ মনে হয় না। তাদের এমন নির্লিপ্ত দ্বিমুখী আচরণ স্পষ্ট করে দেয়, তাদের বুলি আওড়ানো ‘নারী অধিকার’ আসলে পশ্চিমা ও ইসলামবিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার একটা স্ট্র্যাটেজিক প্রক্সি মাত্র!
বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দল পতিত ফ্যাসিস্টদের সিফাত অনুসরণ করে যদি এই ভূখণ্ডে ইসলামোফোবিয়ার চাষাবাদ করতে চায়। তাহলে সেসব ধৃষ্টতা দেখানো ব্যক্তিদের জেনে রাখা উচিত, এই জমিনের তৌহিদী জনতা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এসব মনে রাখছে।
টীকা:-
[১] সূরা আল-আহযাব, ৫৯।
[২] তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪১-৪২ (সূরা নূর, আয়াত: ৩১-এর ব্যাখ্যা)।
[৩] সূরা আন-নূর, ৩১।
[৪] সহিহ বুখারী,৪৭৫৯।
[৫] সহিহ বুখারী, ৪১৪৪।
[৬] মুওয়াত্তা ইমাম মালিক,১০১৮।
[৭] আবু দাউদ-১/৩৩৭।




